“বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’- তাঁর পরিচিতি এখনো অনেকের কাছে একজন শ্রেষ্ঠ কবি,সাহিত্যিক,গল্পকার,নাট্যকার হিসেবে। তার বাইরেও তাঁর আরও একটি পরিচয় রয়েছে – তা হল”চিত্রশিল্পী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর”। কোনরকম প্রথাগত শিক্ষায় শিক্ষিত না হয়েও তিনি শিল্পের প্রচলিত প্রথাকে ভেঙে এক নতুন শিল্প সত্বার জন্ম দিয়েছিলেন। যা আজও বিশ্বের শিল্প রসিকদের কাছে বিস্ময়।
তিমি নিয়মিত ছবি আঁকা শুরু করেন প্রায় সত্তর বছর বয়সে। কোনরকম প্রথাগত শিক্ষা না থাকায় প্রথমদিকে তিনি তাঁর লেখার হিজিবিজি কাটাকুটিগুলিকে একটি চিত্রের রূপ দেওয়ার চেষ্টা করতেন। আর এই প্রচেষ্টা থেকেই শুরু হয় তাঁর ছবি আঁকা। তাছাড়া সে সময় তাঁর আশে পাশে শিল্প চর্চারও একটি আদর্শ পরিবেশ তৈরী হয়েছিল। অবন ঠাকুর, নন্দলাল, রামকিঙ্কর এর মত ব্যক্তিত্ব সেসময় শান্তিনিকেতনকে শিল্পে সমৃদ্ধ করে তুলেছিলেন। তাই লেখালেখির সাথে তিনিও মত্ত হয়ে যান শিল্প চর্চায়। একে একে আঁকতে থাকেন অসংখ্য ছবি। ১৯২৮ থেকে ১৯৩৯ এর মধ্যে তিনি স্কেচ ও ছবি মিলিয়ে প্রায় আড়াই হাজারেরও বেশী সৃষ্টি করে ফেলেন। যার মধ্যে ১৫৭৪ টি ছবি এখনো শান্তিনিকেতনের রবীন্দ্রভবনে সংরক্ষিত আছে।
তাঁর অঙ্কিত ছবি গুলোর অধিকাংশই গুনগত দিক থেকে তৎকালীন সময়ের বিচারে অনেকেটাই এগিয়েছিল। নিঃসন্দেহে যাকে বলা যায় বিশ্বমানের। যা পাশ্চাত্যের শিল্পীরা খুব সহজেই অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। আর একারনেই তাঁর প্রথম একক আন্তর্জাতিক চিত্র প্রদর্শনীর জন্য এগিয়ে আসেন দক্ষিণ ফ্রান্সের শিল্পীরা। তাদেরই উৎসাহে ১৯২৬ খ্রীষ্টাব্দে তাঁর প্রথম চিত্র প্রদর্শনী হয় প্যারিসের”পিগাল আর্ট গ্যালারিতে”।এরপর ধীরে ধীরে সমগ্র ইউরোপ জুড়ে কবির একাধিক চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। তাঁর ছবির অন্যতম বৈশিষ্ট্য – “রং ও রেখার সাহায্যে সংকেতের ব্যবহার”। যা ছিল তাঁর একান্ত নিজস্ব শৈলী। যদিও ভাবনার দিক থেকে তিনি প্রাচ্য চিত্রকলার প্রতি অধিক আগ্রহী ছিলেন। তবে তাঁর নিজের ছবিতে আধুনিক বিমূর্তধর্মিতাই বেশী প্রকাশ পেয়েছে। যেখানে পাশ্চাত্যের প্রভাব লক্ষ্যনীয়। তিনি মূলত কালি-কলমে স্কেচ, জলরং এবং দেশজ রঙের ব্যবহার করে ছবি আঁকতেন। তার অধিকাংশ ছবিতেই দেখা যায় মানুষের মুখের স্কেচ, বিভিন্ন প্রাণীর আদলে কিছু অবয়ব, নিসর্গ দৃশ্য, ফুল, পাখি ইত্যাদি। উল্লেখ্য যে তিনি নিজের প্রতিকৃতিও এঁকেছেন নিজস্ব শৈলীতে। নন্দনতাত্ত্বিক, বর্ণ পরিকল্পনা এবং ভাব গভীরতার দিক থেকে তাঁর ছবিগুলো সত্যিই বেশ অদ্ভুত। এপ্রসঙ্গে উল্লেখ করা প্রয়োজন- তিনি একাধিক অঙ্কনশৈলীও আয়ত্ত করেছিলেন। যার মধ্যে কয়েকটি শৈলী হল- নিউ আয়ারল্যান্ডের হস্তশিল্প, কানাডার পশ্চিম উপকূলের “হাইদা” খোদাইশিল্প ও ম্যাক্স পেকস্টাইনের কাঠখোদাই শিল্প। তাই বলা যেতে পারে তিনি শুধু ছবিই আঁকেননি, তিনি শিল্পের যথেষ্ট গভীরেও প্রবেশ করেছিলেন এবং নতুন এক শিল্প শৈলীর জন্ম দিয়েছিলেন। যা ছিল সম্পুর্নভাবে তাঁর নিজস্ব। তাই তিনি আমাদের কাছে শুধু বিশ্বকবিই নন, সাথে একজন স্বনামধন্য চিত্রশিল্পী। আমার এই ছোট্ট লেখা গুরুদেবের ১৫৯ তম জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলী।