আমার শহর শিলিগুড়িঃ মাত্র আট-নয় বছর বয়স থেকেই তিনি লিখতে শুরু করেন। স্কুলে হাতে লেখা পত্রিকা ‘সঞ্চয়ে’ একটি ছোট্ট হাসির গল্প লিখে তাঁর সাহিত্য জগতে আত্মপ্রকাশ। এর কিছুদিন পর বিজন গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘শিখা’ কাগজে প্রথম ছাপার মুখ দেখে তার লেখা “বিবেকান্দের জীবনী”। মাত্র এগার বছর বয়সে ‘রাখাল ছেলে’ নামে একটি গীতি নাট্যও রচনা করে ফেলেন। এটি পরে তাঁর ‘হরতাল’ বইতে সংকলিত হয়। সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় বাল্য বন্ধু লেখক অরুণাচল বসুর সঙ্গে মিলে আরেকটি হাতে লেখা কাগজ ‘সপ্তমিকা’ সম্পাদনা করেন।
তিনি হলেন মার্কসবাদী চেতনায় আস্থাশীল কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য্য। যিনি তার কাব্য প্রতিভার দ্বারা বাংলা সাহিত্যের আকাশে নিজস্ব স্থান করে নিয়েছেন। সুকান্তকে বলা হয় গণমানুষের কবি। অসহায়-নিপীড়িত সর্বহারা মানুষের সুখ, দুঃখ তার কবিতার প্রধান বিষয়। অবহেলিত মানুষের অধিকার আদায়ের স্বার্থে ধনী মহাজন,অত্যাচারী প্রভুদের বিরুদ্ধে নজরুলের মতো সুকান্তও ছিলেন সক্রিয়। যাবতীয় শোষণ-বঞ্চনার বিপক্ষে সুকান্তের ভাষা ছিল দৃঢ়। তিনি তাঁর কবিতার মাধ্যমে দূর করতে চেয়েছেন শ্রেণী বৈষম্য। মানবতার জয়ের জন্য তিনি লড়াকু ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। অসুস্থতা,অর্থাভাবের কারনে তিনি কখনো থেমে থাকেনি। মানবিক চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে তিনি বিদ্রোহের ডাক দিয়েছেন। তার অগ্নিদীপ্ত সৃষ্টি প্রণোদনা দিয়ে সব ধরনের প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করতে প্রয়াসী ছিলেন। সুকান্ত কমিউনিস্ট পার্টির পত্রিকা দৈনিক স্বাধীনতার (১৯৪৫) ‘কিশোর সভা’ বিভাগও সম্পাদনা করতেন। তার রচনাবলির মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো –

“ছাড়পত্র”(১৯৪৭),”পূর্বাভাস”(১৯৫০),”মিঠেকড়া”(১৯৫১),”অভিযান”(১৯৫৩),”ঘুম নেই”(১৯৫৪), “হরতাল”(১৯৬২),”গীতিগুচ্ছ”(১৯৬৫) প্রভৃতি। পরবর্তীকালে দুই বাংলা থেকে “সুকান্ত সমগ্র” নামে তার রচনাবলীও প্রকাশিত হয়। ফ্যাসিবাদবিরোধী লেখক ও শিল্পীসঙ্ঘের পক্ষে “আকাল”(১৯৪৪) নামে একটি কাব্যগ্রন্থও তিনি সম্পাদনা করেন। সুকান্তের কবিতা বিষয়বৈচিত্র্যে ও লেখনীর দক্ষতায় অনন্য। তিনি বাংলা সাহিত্যকে অনেক কিছু দিয়ে গেছেন। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, দ্বীজেন্দ্রলাল রায়, জীবনানন্দ দাশসহ সে সময়ের বড় বড় কবিদের ভিড়ে তিনি কিন্তু হারিয়ে যাননি। তিনি নিজের যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখে গেছেন নিজ প্রতিভা, মেধা ও মননে। সুকান্ত তাঁর বয়সের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করেছেন তাঁর পরিণত ভাষা এবং ভাবনায়। ভাবনাগত দিকে তিনি তাঁর বয়সের থেকেও অনেক বেশি এগিয়ে ছিলেন।

নিবারন ভট্টাচার্য এবং সুনীতি দেবীর নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে ১৯২৬ সালের ১৫ ই আগস্ট তার জন্ম।লেখা-লেখি সহ পার্টি সংগঠনের কাজে অত্যধিক পরিশ্রমের ফলে নিজের শরীরের উপর যে অত্যাচারটুকু তিনি করেছিলেন তাতে তিনি প্রথমে ম্যালেরিয়া ও পরে দুরারোগ্য ক্ষয়রোগে আক্রান্ত হন। ১৯৪৭ সালের ১৩ই মে মাত্র ২১ বছর বয়সে কলিকাতার ১১৯ লাউডট স্ট্রিটের রেড এড কিওর হোমে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। সুকান্ত ভট্টাচার্যের জীবন মাত্র ২১ বছরের আর লেখালেখি করেন মাত্র ৬ থেকে ৭ বছর। এই অল্প সময়েই তিনি নিজেকে মানুষের কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে বাংলা সাহিত্যের আকাশে উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে আছেন।

আজ তোমার প্রয়াণ দিবসে নিও প্রণাম

— পরিতোষ পাল।